ঢাকাবুধবার , ১৫ মার্চ ২০২৩
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

মোবাইল নেটওয়ার্ক, কেন এ ভোগান্তি

অনলাইন ডেস্ক :
মার্চ ১৫, ২০২৩ ৭:১৫ অপরাহ্ণ । ২২৩ জন
ছবি অনলাইন।

মোবাইল ফোনে কল সংযোগ পাওয়া গেলেও শোনা যায় না কথা। কাউকে ফোনে পাওয়ার চেষ্টা করলে অপর প্রান্ত থেকে স্বয়ংক্রিয় ঘোষণা, কাঙ্ক্ষিত নম্বরটিতে এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। তিন মিনিট কথা বলতে গেলে দুইবার কল ড্রপ। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের এমন ভোগান্তির চিত্র এখন প্রতি মুহূর্তের। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী গ্রাহকদেরও ভোগান্তির শেষ নেই। জরুরি কাজের সময় হঠাৎ কেটে যায় সংযোগ। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি তৈরি হয় সমস্যাও। কিন্তু কেন হচ্ছে এই সমস্যা। কেনইবা গ্রাহকদের এই ভোগান্তি কমাতে পারছে না অপারেটরগুলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ খাতের অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণেই এই সমস্যা বড় হচ্ছে।

 

এ ছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর বিভিন্ন অথরিটির অযাচিত হস্তক্ষেপও নেটওয়ার্ক ভোগান্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্য ও প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, পৃথিবীর কোনো দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর এ ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ নেই। অপারেটররা চাইলেও অনেক সময় তারা গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা দিতে পারছে না। এদিকে অপারেটরদের দাবি, তারা মানসম্মত সেবার জন্য অনেক জায়গায় টাওয়ার বসানোর অনুমতি পান না। আবার কোথাও কোথাও বুস্টার ও জ্যামার বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয় নেটওয়ার্ক। তারা জানান, এ ধরনের অনেক ইস্যু রয়েছে যা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একারণে গ্রাহকরা মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ১৮০ দশমিক ৮০ মিলিয়ন। অন্যদিকে ইন্টারনেট গ্রাহক রয়েছেন ১২৪ দশমিক ০৮ মিলিয়ন। সবমিলিয়ে মোবাইল অপারেটরদের সেবা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের। একের পর এক নিত্য নতুন প্রযুক্তির আগমন আর গ্রাহক সংখ্যা বাড়লেও, বাড়েনি সেবার মান। এজন্য বিপুল পরিমাণ গ্রাহকের বিপরীতে, স্বল্প পরিমাণ তরঙ্গ ব্যবহার করাকেই দায়ী করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অপারেটরদের অভিযোগ, শুধু তাদের কারণে নেটওয়ার্ক ভোগান্তি হচ্ছে না। এর জন্য দায়ী একাধিক কারণ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক বছরে মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে গ্রাহকরা প্রায় ৫০ হাজার অভিযোগ জমা দিয়েছেন বিটিআরসিতে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি ভয়েস কল ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবা নিয়ে। শুধু বিটিআরসিতে জমা পড়া অভিযোগ নয়, গ্রাহকদের সঙ্গে আলাপ করে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তারা বলছেন, মোবাইল ফোনে কথা বলে শান্তি নেই। বার বার কেটে যায়। তবু বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে। সমপ্রতি ফোন ব্যবহারে অনেকে নেটওয়ার্ক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এমনকি রাজধানী ঢাকার গ্রাহকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটওয়ার্ক সমস্যার কথা তুলে ধরছেন। কাউকে ফোন করতে গেলে বা অন্যের ফোন রিসিভ করতে গেলে হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে বা ফোনই করা যাচ্ছে না। সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনকি পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডায় স্থান করে নিচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্ক সমস্যার বিষয়টি।

সবারই একটাই অভিযোগ-দেশে একের পর এক থ্রিজি, ফোরজি, এমনকি ফাইভজি নেটওয়ার্ক চালু করেছে মোবাইল অপারেটরগুলো। কিন্তু তারা সঠিকভাবে গ্রাহকদের সেবা দিতে পারছে না। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, সরকার যখন স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে চাচ্ছে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব যে মুহূর্তে শুরু হয়ে গেছে, ফাইভজি বাস্তবায়ন যখন আমাদের চ্যালেঞ্জ ঠিক সেই সময় দেশের টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবার মান বৃদ্ধি না হয়ে উল্টো দিন দিন কমে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে ফাইবার সেবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থে সারা দেশে ফাইবার নেটওয়ার্ক গড়ে তুললেও তা সামিট এবং ফাইবার অ্যাট হোমের কাছে তুলে দিয়ে বাজার সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়েছে। ফলে ফাইবার কানেক্টিভিটি মাত্র ১৭ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রাহক অনুপাতে স্পেকট্রাম ব্যবহারের পরিমাণ এখনো বৃদ্ধি হয়নি। আবার স্পেকট্রাম বরাদ্দ নিলেও সম্পূর্ণ স্পেকট্রাম এখনো ব্যবহার উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। তিনি বলেন, গ্রাহক অনুপাতে আবার বিটিএস-এর স্বল্পতা রয়েছে। সেই সঙ্গে বিটিএসগুলোর ডিভাইস হুয়াওয়ের কাছে জিম্মি হয়ে যাওয়ায় এই ডিভাইসগুলো মানসম্মত নয়। আবার গ্রাহকদের হাতে ব্যবহৃত ডিভাইসগুলোর মান সেবা অনুপাতে না হওয়ায় নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনা সৃষ্টি হয়। মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এত কিছুর পর আবার সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যত্রতত্র যে জ্যামার ব্যবহার সেই সঙ্গে অনেক গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কের মান বৃদ্ধির জন্য রেপিটার বুস্টার ব্যবহার নেটওয়ার্ক মানে প্রতিবন্ধকতার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে লাভের ভাগাভাগির অংশ পেলেও সেবার মান খারাপ হওয়ার দায়ভার নিতে চায় না। বর্তমানে মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসি মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার মান উন্নয়নে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায়। গ্রাহক ও গ্রাহক এসোসিয়েশনের এ ধরনের বক্তব্যকে অনেকটা পাত্তা না দিয়ে অন্য ব্যাখ্যা দেন বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটররা।

এ প্রসঙ্গে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর শিকদার মানবজমিনকে বলেন, নেটওয়ার্ক কিছু ক্ষেত্রে হঠাৎ নাই হয়ে যায়। এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমাকেও একাধিকবার হতে হয়েছে। তবে সম্প্রতি আমাদের দেশে কলড্রপের পরিমাণ কমেছে। তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত মোবাইল অপারেটরদের সেবার মান বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে থাকি। তাদের সেবা মনিটরিংয়ের জন্য আমাদের একটি টিম রয়েছে। তারা যখনই যে জায়গায় নেটওয়ার্ক সমস্যা পায় তা সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করার নির্দেশনা দিয়ে থাকে। দেশের ৫ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, এয়ারটেল, বাংলালিংক ও টেলিটকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক রয়েছে গ্রামীণফোনের। তাদের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি। গ্রাহকদের ভোগান্তি ও দুর্বল নেটওয়ার্ক প্রসঙ্গে গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস খায়রুল বাশার মানবজমিনকে বলেন, পুরো ঢাকা শহরে ২৭০টি টাওয়ার নির্মাণের চাহিদা রয়েছে গ্রামীণফোনের। শুধু গ্রামীণফোন নয় একই চাহিদা রয়েছে অন্যান্য অপারেটরেরও। এটা ফুলফিল না হওয়ায় বেশ কিছু পকেট তৈরি হয়েছে। এখন প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে কেন অপারেটররা টাওয়ার তৈরি করছে না। আসলে টাওয়ার তৈরির এখতিয়ার এখন আমাদের হাতে নেই। এজন্য টাওয়ার কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। আমরা কোম্পানিকে বলছি- অমুক জায়গায় আমাদের টাওয়ার প্রয়োজন। তখন কোম্পানিগুলো আবার নানা ধরনের জটিলতায় পড়ছে।

যেমন-বিল্ডিংয়ের মালিক রেডিয়েশন বা ক্যান্সার হতে পারে এমন ভুল বার্তার কারণে তার বিল্ডিংয়ে টাওয়ার বসাতে দিতে চায় না। এজন্য সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করি। তিনি বলেন, সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রায় ৮০টি লোকেশন চিহ্নিত করেছি যেখানে আমরা টাওয়ার তৈরির অনুমতি পাচ্ছি না। এর মধ্যে সচিবালয় এলাকা, সংসদ ভবন এলাকা, সুপ্রিম কোর্ট এরিয়া, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মতো জায়গা রয়েছে। খায়রুল বাশার জানান, এর বাইরে ঢাকা শহরে হিউজ পরিমাণ বুস্টার ও জ্যামার ব্যবহার হয়ে থাকে। বিভিন্ন মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জ্যামার চালু করে দেয়। অনেক সময় তারা ভুলে যায় এটা অফ করতে। মহাখালী ডিওএইচএস, মিরপুর, বারিধারা ডিওএইচএস, পুরান ঢাকায় আমরা এ ধরনের প্রচুর ডিভাইস পেয়েছি। এসব সরঞ্জামে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বিটিআরসি’র তত্ত্বাবধানে মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালায়। আসলে এ ধরনের অসংখ্য ইস্যুজ রয়েছে যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। শুধু একা গ্রামীণফোন নয়- যেকোনো অপারেটরের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আবার ঢাকা শহরে যেভাবে র‌্যাপিড আরবাইজেশন হচ্ছে তাতে আমাদের রেডিও প্ল্যানিং অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সবমিলিয়ে আমাদের আন্তরিকতা ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কোনো ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও সেবা দিতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রায় একই বক্তব্য অন্যান্য অপারেটরদেরও। তারা জানান, নিরবচ্ছিন্ন গ্রাহক সেবা দিতে গিয়ে যেসব সমস্যায় পড়ছি তা শুধু আমাদের একার নয়, পারিপার্শ্বিক অনেক কারণও জড়িত। আমরা চেষ্টা করছি, এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে ভালো মানের সেবা দেয়ার।